' দরকার পড়লে আমি খুব প্রাদেশিক/ রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে' - বলেছেন কবীর সুমন। সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্র-এর ধারণাটিই খুব গোলমেলে। এই ধরুন ইউরোপে। কতগুলি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ছাড়া কিছু রাষ্ট্রের সীমানা, নাম এমনকী রূপের কোনও ঠিক ঠিকানা ছিল না দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরে। আবার ধরুন আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশ। এখানে একটি এলাকার লোক ভারতবাসী হিসেবেই নিজেকে জানতে জানতে একদিন আবিষ্কার করল তারা হয় বাংলাদেশি নয় পাকিস্তানী। অর্থাৎ দেশ বা রাষ্ট্র নির্বাচনে আপনার ইচ্ছে বা আপনার পছন্দ বা ভালোবাসা শেষ কথা নয়। রাজনীতি বা অর্থনীতি শেষ কথা। যুদ্ধ শেষ কথা। শাসকগোষ্ঠীর চোখরাঙানি অনেক বড় কথা। কিন্তু হ্যাঁ, কিছু কিছু বিষয়ে রাষ্ট্র নাক গলাতে চাইতে পারে, কিন্তু চাইলেও এখনও পর্যন্ত কিছু করতে পারে না। মায়ের পেটের মধ্যে, আবহমান অবচেতনার জিন বহন করতে করতে যখন আমরা জন্ম নিই, যখন আমাদের আবহমান অবচেতনার অনুভূতিমালার সঙ্গে মিলে মিশে যায় আমাদের মায়ের ভাষা, আমাদের মায়ের স্বপ্নের ভাষা, রাগের ভাষা, ভালোবাসার ভাষা, স্নেহের ভাষা, দুঃখের ভাষা, তখন তা আমাদের জন্ম-মৃত্যু নির্বিশেষে এক চিরকালীন চৈতন্যের সমুদ্রের সঙ্গে আমাদের মিশিয়ে দিয়ে যায়। এটি কেবল বাঙালির ক্ষেত্রে হয় তা তো নয়, হয় একজন তামিলের ক্ষেত্রে, একজন পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে, একজন মণিপুরীর ক্ষেত্রে, একজন তেলেগুভাষীর ক্ষেত্রে এবং সকলের ক্ষেত্রেই। মাতৃভাষাই প্রকৃতপক্ষে আমাদের সেই স্বাধীন দেশের নাম, যেখানে আমাদের কোনও কাঁটাতার নেই, ধর্মের বিভেদ নেই, রাজনীতির চোখরাঙানি নেই। আছে এক বিরাট প্রান্তর, শান্ত নদী, ঝরে পড়ে থাকা পাতার রঙ, ধূসর দিগন্ত, কনে দেখা আলো আর প্রেমিকার চোখের ভিতর এক লালরঙা রাস্তা।
আমরা হচ্ছি সেই জাতি, পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। একটা জায়গায় নয়। বরাক উপত্যকায়, ঢাকায়। আমরা হচ্ছি সেই জাতি, যারা ভাষাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে। যে জাতির এক আন্তর্জাতিক মানের চিত্র পরিচালক দেশ ভাগের পরে কাঁটাতার আকাশযাত্রায় পেরোতে পেরোতে হুহু করে কেঁদে ওঠেন। আবার আমরাই সেই জাতি, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লজ্জাবোধ করেন। বাংলা হিন্দি ইংরিজি মিশ্রণ করে তৈরি করে এক অদ্ভুত সংকরায়িত ভাষা। নতুন প্রজন্ম বাংলা বই পড়তে ভুলে যায়। বাংলা বিজ্ঞাপনের দিকে তাকানো যায় না। বানান ভুল, গদ্য ভুল, শব্দেও ভুল। হিন্দি বাংলা মিশ্রণে এক অদ্ভুত সিনট্যাক্স চলে এখন নির্দ্বিধায়।
নির্লজ্জ ভাবে।
হয়তো কলকাতা নয়, বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখবেন বাংলাদেশের মানুষ এবং প্রবাসী বাঙালিরাই। বলতে অসুবিধা হয় না, কলকাতা এখন বাংলাভাষাকে ভুলতে বসেছে। 'বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে' এ শহরের কারোর কিছু এসে যায় না। চেষ্টা করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এ রাজ্যের হোর্ডিং ইত্যাদিতে বাংলা ভাষা চালু করার। কিন্তু একা তিনি আর কতদূর করতেন?
অথচ এ ভাষা এ দেশের অন্যতম একটি জাতীয় ভাষা। সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি সুমিষ্ট ভাষা। আমাদের গর্বের ভাষা। আমাদের আত্মার ভাষা। স্বপ্নের ভাষা।
কবিতার ভাষা।
তাই এত নিরাশাবাদের সংশয়ের মধ্যেও ২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এ অর্ঘ্য হিসেবে রাখলাম কবিতা। আর কিছুই না।
কয়েকজন অগ্রজকে বাদ দিলে পুরো সংখ্যাটিই তরুণ কবিদের।
ভাষাই আমাদের দেশ, ভাষাই আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের কোনও কাঁটাতার নেই।
( কৃতজ্ঞতা- কবীর সুমন, বার্নার্ড শ, ঋত্বিক ঘটক, জীবনানন্দ দাশ, প্রতুল মুখোপাধ্যায় এবং আল মাহমুদ)
হিন্দোল ভট্টাচার্য
সম্পাদকীয় দপ্তর-- বেবী সাউ, মণিশংকর বিশ্বাস, হিন্দোল ভট্টাচার্য, সন্দীপন চক্রবর্তী, শমীক ঘোষ
abahaman.magazine@gmail.com


















