Thursday, 20 February 2020

সম্পাদকীয় - ' রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে'







' দরকার পড়লে আমি খুব প্রাদেশিক/ রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে' - বলেছেন কবীর সুমন। সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্র-এর ধারণাটিই খুব গোলমেলে। এই ধরুন ইউরোপে। কতগুলি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ছাড়া কিছু রাষ্ট্রের সীমানা, নাম এমনকী রূপের কোনও ঠিক ঠিকানা ছিল না দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরে। আবার ধরুন আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশ। এখানে একটি এলাকার লোক ভারতবাসী হিসেবেই নিজেকে জানতে জানতে একদিন আবিষ্কার করল তারা হয় বাংলাদেশি নয় পাকিস্তানী। অর্থাৎ দেশ বা রাষ্ট্র নির্বাচনে আপনার ইচ্ছে বা আপনার পছন্দ বা ভালোবাসা শেষ কথা নয়। রাজনীতি বা অর্থনীতি শেষ কথা। যুদ্ধ শেষ কথা। শাসকগোষ্ঠীর চোখরাঙানি অনেক বড় কথা। কিন্তু হ্যাঁ, কিছু কিছু বিষয়ে রাষ্ট্র নাক গলাতে চাইতে পারে, কিন্তু চাইলেও এখনও পর্যন্ত কিছু করতে পারে না। মায়ের পেটের মধ্যে, আবহমান অবচেতনার জিন বহন করতে করতে যখন আমরা জন্ম নিই, যখন আমাদের আবহমান অবচেতনার অনুভূতিমালার সঙ্গে মিলে মিশে যায় আমাদের মায়ের ভাষা, আমাদের মায়ের স্বপ্নের ভাষা, রাগের ভাষা, ভালোবাসার ভাষা, স্নেহের ভাষা, দুঃখের ভাষা, তখন তা আমাদের জন্ম-মৃত্যু নির্বিশেষে এক চিরকালীন চৈতন্যের সমুদ্রের সঙ্গে আমাদের মিশিয়ে দিয়ে যায়। এটি কেবল বাঙালির ক্ষেত্রে হয় তা তো নয়, হয় একজন তামিলের ক্ষেত্রে, একজন পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে, একজন মণিপুরীর ক্ষেত্রে, একজন তেলেগুভাষীর ক্ষেত্রে এবং সকলের ক্ষেত্রেই। মাতৃভাষাই প্রকৃতপক্ষে আমাদের সেই স্বাধীন দেশের নাম, যেখানে আমাদের কোনও কাঁটাতার নেই, ধর্মের বিভেদ নেই, রাজনীতির চোখরাঙানি নেই। আছে এক বিরাট প্রান্তর, শান্ত নদী, ঝরে পড়ে থাকা পাতার রঙ, ধূসর দিগন্ত, কনে দেখা আলো আর প্রেমিকার চোখের ভিতর এক লালরঙা রাস্তা।
আমরা হচ্ছি সেই জাতি, পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। একটা জায়গায় নয়। বরাক উপত্যকায়, ঢাকায়। আমরা হচ্ছি সেই জাতি, যারা ভাষাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে। যে জাতির এক আন্তর্জাতিক মানের চিত্র পরিচালক দেশ ভাগের পরে কাঁটাতার আকাশযাত্রায় পেরোতে পেরোতে হুহু করে কেঁদে ওঠেন। আবার আমরাই সেই জাতি, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লজ্জাবোধ করেন। বাংলা হিন্দি ইংরিজি মিশ্রণ করে তৈরি করে এক অদ্ভুত সংকরায়িত ভাষা। নতুন প্রজন্ম বাংলা বই পড়তে ভুলে যায়। বাংলা বিজ্ঞাপনের দিকে তাকানো যায় না। বানান ভুল, গদ্য ভুল, শব্দেও ভুল। হিন্দি বাংলা মিশ্রণে এক অদ্ভুত সিনট্যাক্স চলে এখন নির্দ্বিধায়।
নির্লজ্জ ভাবে।
হয়তো কলকাতা নয়, বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখবেন বাংলাদেশের মানুষ এবং প্রবাসী বাঙালিরাই। বলতে অসুবিধা হয় না, কলকাতা এখন বাংলাভাষাকে ভুলতে বসেছে। 'বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে' এ শহরের কারোর কিছু এসে যায় না। চেষ্টা করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এ রাজ্যের হোর্ডিং ইত্যাদিতে বাংলা ভাষা চালু করার। কিন্তু একা তিনি আর কতদূর করতেন?
অথচ এ ভাষা এ দেশের অন্যতম একটি জাতীয় ভাষা। সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি সুমিষ্ট ভাষা। আমাদের গর্বের ভাষা। আমাদের আত্মার ভাষা। স্বপ্নের ভাষা।
কবিতার ভাষা।
তাই এত নিরাশাবাদের সংশয়ের মধ্যেও ২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এ অর্ঘ্য হিসেবে রাখলাম কবিতা। আর কিছুই না।
কয়েকজন অগ্রজকে বাদ দিলে পুরো সংখ্যাটিই তরুণ কবিদের। 

ভাষাই আমাদের দেশ, ভাষাই আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের কোনও কাঁটাতার নেই।

( কৃতজ্ঞতা- কবীর সুমন, বার্নার্ড শ, ঋত্বিক ঘটক, জীবনানন্দ দাশ, প্রতুল মুখোপাধ্যায় এবং আল মাহমুদ)

হিন্দোল ভট্টাচার্য


সম্পাদকীয় দপ্তর-- বেবী সাউ, মণিশংকর বিশ্বাস, হিন্দোল ভট্টাচার্য, সন্দীপন চক্রবর্তী, শমীক ঘোষ


abahaman.magazine@gmail.com 

সন্মাত্রানন্দ




সাক্ষী 

মৃত্যুর মাথার কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছেন
চিতাধূমে একজন জীবিত আছেন
সোমক, ধারণ করো এই হবি, 
ঘৃতধারা ঢালো এই অনল শরীরে
জ্বলে জ্বলে শিখামালা, অবশেষে সেও তো অপায়ী
যখন নিভেছে হোম একজন কখনও নেভেনি
মৃত্যুর মাথার কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছেন
মানুষ মিলিত হয়ে শূকর প্রসব করে রোজ
সেই সব শূকরের আর্তনাদ শেষ হয়ে যায়
তখনও নীরব হয়ে একজন দাঁড়িয়ে আছেন

আগর্ভ অন্ধকারে জানি আমি তিনিই শুশ্রূষা

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়






হানিমুন


তিস্তাবাজার থেকে নেমে এসেছি আরও নীচে।
যেখানে,রঙ্গিত এসে তিস্তার সঙ্গে মেশে!
এ'সত্য চিরসত্য নয়...
তাই, শীত কাঁপিয়ে দিয়ে পিশাচীর হাসি শুরু হয়ে গেল!
বুটিদার লালখোল শাড়ি,ফ্যাব ইন্ডিয়ার পাঞ্জাবি
সিঁদুর-সিঁদুর ভয় পেল।
ভয়, আজীবন সঙ্গে যাবে

যশোধরা রায়চৌধুরী










শব্দ


দুটি শব্দ পাশাপাশি বসাতেই বিস্ফোরণ, উড়ে গেল ছাত
দুটি শব্দ আড়াআড়ি মুখে মুখ, চুম্বনের সুখে
সদ্যই রচিত হল অমোঘ বৈষ্ণব পদাবলী

এভাবেই প্রতিদিন শব্দ যায় শব্দ পড়ে থাকে
শব্দকুতুহলী লোক নিজস্ব কলকাঠি নেড়ে
নিজের ভেতর অব্দি আলো মেলে দেয়
নিজের ভেতরে থেকে অন্ধকার টেনে এনে মেলে দেয় বাইরে, ওদিকে...

সেখানে ছলাচ্ছল জল
সেখানে নদীর পাড় ভাঙে
সেখানে ভাষার নিচু পথে
জল উঠে এসেছে উঠোনে

দুটি শব্দ পাশাপাশি হাত তুলে দাঁড়াতেই জ্বলে উঠল বিদ্রোহের মুখ।
হেরে যাবে এদিকে যন্ত্রণা আর ওদিকে অসুখ।

শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী





গন্তব্য

আজীবন যুবক আর আজীবন মৃত কোনো
কবির এলিজির মত বিষণ্ণ সুরের কথা মনে হত
তোমার সকাশে। উড়ে যেত সমস্ত ঝরে যাওয়া ফুলেল দুপুর --
মৃদুল ছোঁওয়ার মত নিরুপায় বালাপোষ-প্রেম –
চত্ত্বর চত্ত্বরে যখন প্রতিভাদের সমাবেশ,
মনে পড়ে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া  ঊষা ফ্যাক্টরী।
তার বুকে চেপে বসা শপিং মলের দর, বিভিন্ন বিদেশী কুইজিন,
তোমার উষ্ণতারা আজীবন যুবক আর আজীবন মৃত কোনো
কবির এলিজির মত পড়ে থাকে মনে পড়া ঘাসে –
মরা ঘাস, মরে যাওয়া ফ্যাক্টরীর মাঠ আর
স্মৃতি হয়ে যাওয়া সব শিশুদিবসের স্যাক রেস;
কোথায় যাচ্ছি আমরা? দলবেঁধে, একা একা, বাসে --
বন্ধুরা প্রতিবাদ সেরে টেরে মলে চলে আসে।

সু র ঞ্জ ন রা য়




























ধর্মান্ধ-ফ্যাসিস্ত রাত 

অন্ধকারে অতর্কিতে মুখোসের আড়ালে আড়ালে
বিরুদ্ধ আবেগ মেখে হাতে নিয়ে হিংসার ফসল
এগিয়েছে রক্তলোভী,খিদেভরা পশুদের দল
ধর্মান্ধ,ফ্যাসিস্ত-রাত ঝুলে আছে গাছেদের ডালে...

মাথায় মাথায় জ্বলছে নিগৃহীত নিন্দা, গালে গালে 
এসে পড়ছে চূড়ান্ত থাপ্পর দ্যাখো,বীর্য বাহুবল! 
ক্ষমতার বিজ্ঞাপন সাঁটা আছে, দু'চোখের জল
অরক্ষিত মানুষের স্বপ্নহীন দেয়ালে দেয়ালে...!

কী হবে তুমুল ক্ষয়---,কেন্দ্রমুখী সাহসের ভয়
আমাদের জাগতিক বেঁচে থাকা জ্বলছে ঘৃণাভরা
সভ্যতার নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে...শুধু জয়-পরাজয়...

অন্ধকারে মুখোসের আড়ালে আড়ালে জরো করা
হিংসার বিচ্ছিন্ন নাম,ভেদাভেদ জাতীয় বিস্তার
ধর্মান্ধ-ফ্যাসিস্ত রাত ঢেকেছে লজ্জায় মুখ তার! 

অমিত সরকার








জলের জন্য কবিতাগুচ্ছ  
রাহুজন্ম ভেসে যাচ্ছে অস্থির শ্রাবণে
জল বাড়তে বাড়তে অজান্তেই ছুঁয়ে ফেলছে বিপদসীমা
এতদিন একসাথে থাকতে থাকতে
আজকাল সেও অবাধ্য হয়ে গেছে খুব  
জাদুকাঠির শাসন না মেনে
ভিজিয়ে দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে আঙুলের ফাঁক দিয়ে
বোঝাচ্ছি খুব,  কিন্তু কথা শুনছে না     

তোমাকেও সাবধান করে রাখছি,
আমি কিন্তু আরেকটু হলেই গলে যাবো...
ভিজতে ভিজতে দেখা করতে আসোনি কখনো,
বৃষ্টি হতে পারে ভেবে এতদূর থেকে আসতে বারন করলে,
অথচ সেদিনই বাংলা আকাদেমি শুকনো খটখটে
কলেজস্ট্রিটের বুকের ভেতর
আমিই শুধু ভিজে যাচ্ছি, ভিজে যাচ্ছি...  
না হয়, একটু পরেই আসতে
না হয়, ভিজে যেত ফিকে সবুজ শাড়িটা,
প্রুফের গোছা, চ্যানেল সংবাদ, আমাদের পরচর্চার যাপনচিত্র
চর্যাপদ আর জলপরিরা,
আমি শুধুই দেখতে চেয়েছিলাম
রাগ ভাটিয়ারে বৃষ্টি নেমে আসছে তোমার আঁখিপল্লব থেকে...  

বৃষ্টি এলে এরপর থেকে তোমাকে জল বলে ডাকবো...      

কস্তুরী সেন





ঘর


-এসব নতুন লেখা, নতুন, নতুন
-কী ক'রে নতুন, কী ক'রে
(নতুন লেখার গায়ে রোদ জল
নতুন লেখার গায়ে টবের দোপাটি)

-এখন দোপাটি হয়? 
(হয়েছিল...জলস্থলচরাচরসার)

নতুন লেখারা আসে
নতুন লেখারা বেড়ে ওঠে
(টব জানলা, দেখে যাও একই হিম মাঝরাত্রে ছাদে)

কে লেখা থামিয়ে দিল, দিয়েছিল,
-অথচ কী ভাল লিখত, এ কথা মানিই
(কয়েকবছর পর, আর গল্প খুঁজে পাওনি...)

আমিও কি পারি
কবিতা থামিয়ে দিতে
আরেকবার কেড়ে নিতে
তোমার নিশ্চিন্ত ঘর, মাথার বালিশ

সুদীপ বসু





অন্তুদের বাড়ি

যে  গান আমি কুড়িয়ে এনে রেখেছিলাম
ওই ঘুমের শিয়রে
তাকে নিয়ে তুমি কী করেছো ?
আমি  যে  পিস্তলের  ভেতরের অন্ধকার
রাস্তা  থেকে
কুড়িয়ে  আনলাম
তাকে  তুমি  কোথায়  রাখলে ?

শুধু  ভাঙচুর ?  শুধু  লুঠপাট ?
শুধু  চিৎকার ?

দ্যাখো
হাতের  ভেতরে  হাত  আজও
চমকে ওঠে--
চাঁদ  ঠিক  চিনে নেয়
অন্তুদের  বাড়ির  দোতলা  --
বলেঃ
আয়না কি একার  নাকি কারও ?
আয়না ?  একার ?

তুমি
আমাকে হ্যারাস  করো
আমাকে ঠকাও
আমাকে ঘোরাও  কেন

আমি কি কুমকুম ?





বেবী সাউ




ফাগুনিয়া


১ 

একা এক নিঃসঙ্গতার মাঝে কিছু দানা ছড়িয়ে দাও রোজ 

বিকেলের পোড় খাওয়া রোদ চা খেতে খেতে সেই গল্প শোনে
শোনে,  একটা বাসস্থান গড়ে তুলতে হলে সংগ্রহে চাই কিছু মৃত গাছ, ডালপালা এবং কিছু বন্যপ্রাণীর হাড় এবং মাংস 

সংগ্রহে রাখা চাই পুব ও পশ্চিম কোণের মানচিত্র 
একটা বিরাট সূর্যে রোজ অস্ত যাওয়ার মতো অবসর

তোমার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে,  মুখে এসে জমা হয় হাজার বছরের লালা, থুতু, কফ... 

এসব লোভনীয় প্রস্তাব তোমাকে কেউ কখনও দিতে পারে নি
ভেবেই, রোমাঞ্চ জাগে...

আরও নিঃসঙ্গতার দিকে হেঁটে যাও তুমি...




কোনকিছু ভালো লাগে না যখন
ধীরে ধীরে জাগি 

আলতার শিশি খুলে বসি 

সূর্যাস্ত নামে পরিচিত জলে 

কতদিন পরে মৃতের খোলস ভেঙে 
জেগে ওঠো তুমি 

মমির বেশে




কেউ কখনও কাঁদেনি আমার জন্য 

অসংখ্য মৃতের পাশে ঝরা পাতার উৎসব গেঁথে গেছে শুধু

মেঘের কাছে হাত পাততে পাততে 
পাখির ডানা চাওয়া বারবেলা
আর ডাঁসা পেয়ারার লোভে 
শুকনো অবগাহন রেখে আসি 

গাছের কাছে

আগুনে ঝলসে ওঠে শূকরের শব
মিশরীয় স্থাপত্যে ভাসে দিন 
রাত 
নির্মেদ কোলাহল  

গোপন সুড়ঙ্গ জুড়ে শঙ্খচূড়-শিস 
শূন্যতা ইতিহাস খেলা করে 

বিদ্ধ করো হে তথাগত !

আমি স্নান সেরে উঠি

অরিজিৎ চক্রবর্তী





অভিজ্ঞান


প্রাকমিলনের মৌন অভিসারে
আমি ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখলাম

তোমার নাম দিলাম ভোরবেলা

প্রাণের কাছে পদ্ম ফুটলো,
তাকে জড়িয়ে ধরলো সাপ

তারপর বহু অনুপম জলাশয়ে
তেইজি সাগার মতো
হাঁসের ছবি তুলে তোমাকে
বানালাম হাঁস

তুমি ভাসালে নিজেকে...
তুমি ওড়ালে নিজেকে...

কত হাঁস, কত গভীরতা

জলরেখাময় পৃথিবীর
চৈচৈ হাঁসগুলি
তেইজি সাগাকে যেমন বলত,
আমাকেও বলল তেমন : এসো ছবি নাও সাদা প্রজনন...

স্থির হলো আমার প্রণাম!

পৌলমী গুহ





একটি কবিতা


নিজের হত্যার কাছে হাতজোড় করি,
দিক ভুলে যাই।
মৃত্যুকে নিজের বলে মনে হতে থাকে।
যেসব আদর ছড়িয়েছি এতোকাল,
তাদের আর্তি বাজে কানে।
বেদনার সীমা মেপে মেপে
পা ফেলি শহরের আনাচে-কানাচে।
গঙ্গাযাত্রীর চোখের মতো,
অদ্ভুত আলো ঘিরে থাকে।
রাতে বিছানায় ফিরে এসে ফের,
নিজের হত্যার কাছে হাতজোড় করি।

Wednesday, 19 February 2020

সুদীপ ঘোষাল





সারাংশ
গঙ্গাস্নানে  মন খারাপের গন্ধটা গেলো না
আমার জিভে নোন্তাজলের স্বাদ,ঢোক গিলছি বাধ্যস্বরে
সহজ সুরে মেতে যায় কলরব, মনের কোণে তবু  বিষন্নতা
 যে যার ঘরে ফেরে আপন ঘর ভুলে মোহবশে
গঙ্গাবক্ষে  থাকে  উলঙ্গ ছেলে কোলে অসংখ্য মা
ওরা সারাংশ বোঝে কি? সত্য নির্জন সে ঘর
বিসর্জনের পরেও তাই ওদের ঘরে ফেরার তাড়া নেই
ওরাও মিলিত হবে সম্মেলনে, আপন ঘরে...

সুমন কুণ্ডু





' সন্ধে সময় '
যেকোনো মনভার খুঁড়ে
জানাতে পারি হিসেবনিকেশ
বিক্ষোভ থেকে
এসময় এতটুকু মিথ্যা আসে না
দু একটা হা-পিত্যেশ নিয়ে
রাতদিন বসে থাকি
তোমাকে জানাবো না
চিলেকোঠার অদূরে
আলো ছোঁয়া পাখি কত যাতায়াত করে 

রবিন বণিক





এই  মুহূর্তে


এই  মুহূর্তে  যারা  আমার  শরীর  ছুঁয়ে  দেখবার  জন্য  সাতবার  ভাবছেন
এই  মুহূর্তে  যারা  আমার  খুলির  ভেতর  কথা  সাজিয়ে  রাখছেন
এই  মুহূর্তে  যারা  আমার  কুয়াশার  ভেতরে  বসে  মদ  গিলছেন
এই  মুহূর্তে  যে  চারজন  এখনো  আসতে  পারেননি
এই  মুহূর্তে  যারা  কেটে  পড়ার  ভঙ্গিমায়  দূরে  অপেক্ষমান
এই  মুহূর্তে  যারা  তালিকা  নতুনভাবে  তৈরী  করবার  জন্য  প্রস্তুতি  নিয়েছেন 

আমি  নিশ্চিত  তারা  প্রত্যেকেই  অনুগল্পের  প্রবর্তক
আমি  নিশ্চিত  তারা  প্রত্যেকেই  বৃদ্ধাশ্রমে  গচ্ছিত  রেখেছেন  শালিখের  ওম

আমি  নিশ্চিত  তারা  প্রত্যেকেই  উৎসে  ঝুলিয়ে  রেখেছেন  শূন্যস্থান।


রাখী সরদার




সময়

              

পতাকাওয়ালা দুটো নীল ঘড়ি থেকে
কাঁটা বের হয়ে এতগুলো মানুষের
গলা ফুটো করে দিল

তবুও তোমার ঘড়ি চাই!

সরল সুস্থির রক্ত একা একা পড়ে আছে
পিছল রাস্তায় তুমি পা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলেছো 

কতদিন এভাবে কাটাবে?
দুটো থেকে যদি দুহাজার ঘড়ি উড়ে আসে
পারবে কাঁটা ভেঙে উলটো পথে হেঁটে যেতে?

        




লবণ পাথর
             
তুমি চলে যাচ্ছো
জোরালো প্রত্যাখানে...
তাও তাকিয়েই থাকি।তাকিয়েই থাকি
না বোঝার অজুহাতে।
কখন পাশ কাটিয়ে উড়ে গেল
বিস্তারিত মেঘ।লকলকে সমুদ্রখানি
নাচতে নাচতে নীল... এসবের কিছুই জানিনা।
সচেতনে ঝড় এলে
চোখের সংগম মুছে দেখি
আমি এক আধোডোবা লবণ পাথর
যাকে রোজ খেয়ে ফেলে অন্যমনস্ক সাদা বুদ্বুদ।

গৌতম কুমার গুপ্ত





অর্কিড ফিউচার  

একটি গান সম্পূর্ণ হবার আগেই 
                   উথলে উঠল দুধ
ডেকে উঠল গৃহপালিত একটি ম্যাকাও
একটি কাঠবিড়ালী দ্রুত উধাও হল
গিরগিটির রঙে বদল হল ছদ্মরূপ 

রসুইঘরে সারি সারি বাদামী গৃহিনী
তেলেজলে বারোমাস 
      গুছোনো হল না আলমারি
মিটসেফে হরিদ্রা সর্ষের হাড়জ্বলুনি সাঁঝবেলা
এবারেও হল না যাওয়া অলীক চড়ুইভাতি

পূর্বাশা ফ্ল্যাটের গোগুলের মা বাবা গেছে সুন্দরবন
জলবায়ু আবাসনের বৃন্দারা হরিদ্বার গারোয়াল
এখানে পুড়ছে কারো ম্যানিকিউরড নেলপালিশ
খুঁটে বাঁধা প্রমোদের কয়েকটি খুচরো সিকি আধুলি

ফুল্লরার বারোমাস্যা কিছু নিঃশ্বাসের ভায়োলিন
দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকছে অর্কিড ফিউচার
কোথাও একদিন কোথাও চিরদিন সর্বনাশা সুখ

রোমেল রহমান





মাতৃভাষা


তোমার জন্য সেই যে মিছিল
এই যে মিছিল রোজ
এই যে কড়া
এই যে মিঠে
রঙের সুরে বলা
বুকের রক্তে কিনে আনা আমার বাংলা ভাষা

এই যে আমি
রোজ হেঁটে যাই
রোজ বলে যাই কথা
এই যে লেখা এই যে পড়া
এই যে খিস্তিখেউর
এই যে মধুর কণ্ঠে শুনি
তুমুল ভালোবাসি
সবই আমার রক্ত দিয়ে কেনা
তোমার বুকে শব্দে মেলি ডানা
একলা হেঁটে গুণগুনিয়ে 
হঠাৎ ক্ষেপে বলা
বুকের রক্তে কিনে আনা আমার মতৃভাষা

পঙ্কজ চক্রবর্তী





খাঁচা

মা ভাত বেড়ে দিচ্ছে গভীর রাতে
এই দৃশ‍্যের পাশে বসে আছে ঘুমন্ত প্রেমিক

মা তাঁকে চেনে না
অকালমৃত স্বামী ভেবে খাওয়ার আসন পেতেছে

অনেক রাতে ছাদের উপর শুনতে পাই
পাগলের অট্টহাসি

যেন ছদ্মবেশ - প্রতিটি পুরুষের একই বিষণ্ণতা

টপকে যাচ্ছে সংসার
বলছে  : আমার অনেক কাজ,এভাবে ডেকো না


 

রাজদীপ ভট্টাচার্য





নারীজন্ম

সুডৌল রাত্রি থেকে মুছে যাচ্ছে নদীর ইতিহাস
পল্লী বসতি জুড়ে ইঁটভাটা বাহারি বাগান
হিমঘরে স্তূপাকার রাঙতার রঙিন জলছবি
বালিশে তোশকে কিছু গোঙানি ও গোপন প্রতিরোধ
এভাবেই গড়ে ওঠে কালভার্ট, গভীর নলকূপ
সড়ক যোজনা পথ, সুসজ্জিত পঞ্চায়েত ভবন
টিভি আসে ঘরে ঘরে সাথে নিয়ে কেবলের তার
স্মার্টফোন, এ জগৎ জুড়ে দেয় তরঙ্গের জাল
নদীর শরীরে আজ মেছোভেড়ি, নাবাল ধানজমি
প্রাচীণ জলধারা ছেঁড়া ছেঁড়া পুকুরের সারি
তবু আজও কদাচিৎ কৃষকের লাঙলের ঘায়
উঠে আসে অতীতের সামুদ্রিক নৌকার খোল
অঝোরে বর্ষা এলে ভেসে যায় দুপাড়ের গ্রাম
সব শোক শুষে নেবে এমন আঁচল পাবো কই!
গাঁওবুড়ো আজকাল ভুলে যায় শৈশবের কথা
বিড়বিড় করে মরে, কি যে ছিলো নদীটির নাম?

একনজরে

সম্পাদকীয় - ' রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে'

' দরকার পড়লে আমি খুব প্রাদেশিক/ রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে' - বলেছেন কবীর সুমন। সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্র-এর ধারণাট...

পাঠকের নজরে