Thursday, 20 February 2020

সম্পাদকীয় - ' রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে'







' দরকার পড়লে আমি খুব প্রাদেশিক/ রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে' - বলেছেন কবীর সুমন। সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্র-এর ধারণাটিই খুব গোলমেলে। এই ধরুন ইউরোপে। কতগুলি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ছাড়া কিছু রাষ্ট্রের সীমানা, নাম এমনকী রূপের কোনও ঠিক ঠিকানা ছিল না দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরে। আবার ধরুন আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশ। এখানে একটি এলাকার লোক ভারতবাসী হিসেবেই নিজেকে জানতে জানতে একদিন আবিষ্কার করল তারা হয় বাংলাদেশি নয় পাকিস্তানী। অর্থাৎ দেশ বা রাষ্ট্র নির্বাচনে আপনার ইচ্ছে বা আপনার পছন্দ বা ভালোবাসা শেষ কথা নয়। রাজনীতি বা অর্থনীতি শেষ কথা। যুদ্ধ শেষ কথা। শাসকগোষ্ঠীর চোখরাঙানি অনেক বড় কথা। কিন্তু হ্যাঁ, কিছু কিছু বিষয়ে রাষ্ট্র নাক গলাতে চাইতে পারে, কিন্তু চাইলেও এখনও পর্যন্ত কিছু করতে পারে না। মায়ের পেটের মধ্যে, আবহমান অবচেতনার জিন বহন করতে করতে যখন আমরা জন্ম নিই, যখন আমাদের আবহমান অবচেতনার অনুভূতিমালার সঙ্গে মিলে মিশে যায় আমাদের মায়ের ভাষা, আমাদের মায়ের স্বপ্নের ভাষা, রাগের ভাষা, ভালোবাসার ভাষা, স্নেহের ভাষা, দুঃখের ভাষা, তখন তা আমাদের জন্ম-মৃত্যু নির্বিশেষে এক চিরকালীন চৈতন্যের সমুদ্রের সঙ্গে আমাদের মিশিয়ে দিয়ে যায়। এটি কেবল বাঙালির ক্ষেত্রে হয় তা তো নয়, হয় একজন তামিলের ক্ষেত্রে, একজন পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে, একজন মণিপুরীর ক্ষেত্রে, একজন তেলেগুভাষীর ক্ষেত্রে এবং সকলের ক্ষেত্রেই। মাতৃভাষাই প্রকৃতপক্ষে আমাদের সেই স্বাধীন দেশের নাম, যেখানে আমাদের কোনও কাঁটাতার নেই, ধর্মের বিভেদ নেই, রাজনীতির চোখরাঙানি নেই। আছে এক বিরাট প্রান্তর, শান্ত নদী, ঝরে পড়ে থাকা পাতার রঙ, ধূসর দিগন্ত, কনে দেখা আলো আর প্রেমিকার চোখের ভিতর এক লালরঙা রাস্তা।
আমরা হচ্ছি সেই জাতি, পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। একটা জায়গায় নয়। বরাক উপত্যকায়, ঢাকায়। আমরা হচ্ছি সেই জাতি, যারা ভাষাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে। যে জাতির এক আন্তর্জাতিক মানের চিত্র পরিচালক দেশ ভাগের পরে কাঁটাতার আকাশযাত্রায় পেরোতে পেরোতে হুহু করে কেঁদে ওঠেন। আবার আমরাই সেই জাতি, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে গিয়ে লজ্জাবোধ করেন। বাংলা হিন্দি ইংরিজি মিশ্রণ করে তৈরি করে এক অদ্ভুত সংকরায়িত ভাষা। নতুন প্রজন্ম বাংলা বই পড়তে ভুলে যায়। বাংলা বিজ্ঞাপনের দিকে তাকানো যায় না। বানান ভুল, গদ্য ভুল, শব্দেও ভুল। হিন্দি বাংলা মিশ্রণে এক অদ্ভুত সিনট্যাক্স চলে এখন নির্দ্বিধায়।
নির্লজ্জ ভাবে।
হয়তো কলকাতা নয়, বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখবেন বাংলাদেশের মানুষ এবং প্রবাসী বাঙালিরাই। বলতে অসুবিধা হয় না, কলকাতা এখন বাংলাভাষাকে ভুলতে বসেছে। 'বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে' এ শহরের কারোর কিছু এসে যায় না। চেষ্টা করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এ রাজ্যের হোর্ডিং ইত্যাদিতে বাংলা ভাষা চালু করার। কিন্তু একা তিনি আর কতদূর করতেন?
অথচ এ ভাষা এ দেশের অন্যতম একটি জাতীয় ভাষা। সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি সুমিষ্ট ভাষা। আমাদের গর্বের ভাষা। আমাদের আত্মার ভাষা। স্বপ্নের ভাষা।
কবিতার ভাষা।
তাই এত নিরাশাবাদের সংশয়ের মধ্যেও ২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এ অর্ঘ্য হিসেবে রাখলাম কবিতা। আর কিছুই না।
কয়েকজন অগ্রজকে বাদ দিলে পুরো সংখ্যাটিই তরুণ কবিদের। 

ভাষাই আমাদের দেশ, ভাষাই আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের কোনও কাঁটাতার নেই।

( কৃতজ্ঞতা- কবীর সুমন, বার্নার্ড শ, ঋত্বিক ঘটক, জীবনানন্দ দাশ, প্রতুল মুখোপাধ্যায় এবং আল মাহমুদ)

হিন্দোল ভট্টাচার্য


সম্পাদকীয় দপ্তর-- বেবী সাউ, মণিশংকর বিশ্বাস, হিন্দোল ভট্টাচার্য, সন্দীপন চক্রবর্তী, শমীক ঘোষ


abahaman.magazine@gmail.com 

সন্মাত্রানন্দ




সাক্ষী 

মৃত্যুর মাথার কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছেন
চিতাধূমে একজন জীবিত আছেন
সোমক, ধারণ করো এই হবি, 
ঘৃতধারা ঢালো এই অনল শরীরে
জ্বলে জ্বলে শিখামালা, অবশেষে সেও তো অপায়ী
যখন নিভেছে হোম একজন কখনও নেভেনি
মৃত্যুর মাথার কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছেন
মানুষ মিলিত হয়ে শূকর প্রসব করে রোজ
সেই সব শূকরের আর্তনাদ শেষ হয়ে যায়
তখনও নীরব হয়ে একজন দাঁড়িয়ে আছেন

আগর্ভ অন্ধকারে জানি আমি তিনিই শুশ্রূষা

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়






হানিমুন


তিস্তাবাজার থেকে নেমে এসেছি আরও নীচে।
যেখানে,রঙ্গিত এসে তিস্তার সঙ্গে মেশে!
এ'সত্য চিরসত্য নয়...
তাই, শীত কাঁপিয়ে দিয়ে পিশাচীর হাসি শুরু হয়ে গেল!
বুটিদার লালখোল শাড়ি,ফ্যাব ইন্ডিয়ার পাঞ্জাবি
সিঁদুর-সিঁদুর ভয় পেল।
ভয়, আজীবন সঙ্গে যাবে

যশোধরা রায়চৌধুরী










শব্দ


দুটি শব্দ পাশাপাশি বসাতেই বিস্ফোরণ, উড়ে গেল ছাত
দুটি শব্দ আড়াআড়ি মুখে মুখ, চুম্বনের সুখে
সদ্যই রচিত হল অমোঘ বৈষ্ণব পদাবলী

এভাবেই প্রতিদিন শব্দ যায় শব্দ পড়ে থাকে
শব্দকুতুহলী লোক নিজস্ব কলকাঠি নেড়ে
নিজের ভেতর অব্দি আলো মেলে দেয়
নিজের ভেতরে থেকে অন্ধকার টেনে এনে মেলে দেয় বাইরে, ওদিকে...

সেখানে ছলাচ্ছল জল
সেখানে নদীর পাড় ভাঙে
সেখানে ভাষার নিচু পথে
জল উঠে এসেছে উঠোনে

দুটি শব্দ পাশাপাশি হাত তুলে দাঁড়াতেই জ্বলে উঠল বিদ্রোহের মুখ।
হেরে যাবে এদিকে যন্ত্রণা আর ওদিকে অসুখ।

শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী





গন্তব্য

আজীবন যুবক আর আজীবন মৃত কোনো
কবির এলিজির মত বিষণ্ণ সুরের কথা মনে হত
তোমার সকাশে। উড়ে যেত সমস্ত ঝরে যাওয়া ফুলেল দুপুর --
মৃদুল ছোঁওয়ার মত নিরুপায় বালাপোষ-প্রেম –
চত্ত্বর চত্ত্বরে যখন প্রতিভাদের সমাবেশ,
মনে পড়ে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া  ঊষা ফ্যাক্টরী।
তার বুকে চেপে বসা শপিং মলের দর, বিভিন্ন বিদেশী কুইজিন,
তোমার উষ্ণতারা আজীবন যুবক আর আজীবন মৃত কোনো
কবির এলিজির মত পড়ে থাকে মনে পড়া ঘাসে –
মরা ঘাস, মরে যাওয়া ফ্যাক্টরীর মাঠ আর
স্মৃতি হয়ে যাওয়া সব শিশুদিবসের স্যাক রেস;
কোথায় যাচ্ছি আমরা? দলবেঁধে, একা একা, বাসে --
বন্ধুরা প্রতিবাদ সেরে টেরে মলে চলে আসে।

সু র ঞ্জ ন রা য়




























ধর্মান্ধ-ফ্যাসিস্ত রাত 

অন্ধকারে অতর্কিতে মুখোসের আড়ালে আড়ালে
বিরুদ্ধ আবেগ মেখে হাতে নিয়ে হিংসার ফসল
এগিয়েছে রক্তলোভী,খিদেভরা পশুদের দল
ধর্মান্ধ,ফ্যাসিস্ত-রাত ঝুলে আছে গাছেদের ডালে...

মাথায় মাথায় জ্বলছে নিগৃহীত নিন্দা, গালে গালে 
এসে পড়ছে চূড়ান্ত থাপ্পর দ্যাখো,বীর্য বাহুবল! 
ক্ষমতার বিজ্ঞাপন সাঁটা আছে, দু'চোখের জল
অরক্ষিত মানুষের স্বপ্নহীন দেয়ালে দেয়ালে...!

কী হবে তুমুল ক্ষয়---,কেন্দ্রমুখী সাহসের ভয়
আমাদের জাগতিক বেঁচে থাকা জ্বলছে ঘৃণাভরা
সভ্যতার নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে...শুধু জয়-পরাজয়...

অন্ধকারে মুখোসের আড়ালে আড়ালে জরো করা
হিংসার বিচ্ছিন্ন নাম,ভেদাভেদ জাতীয় বিস্তার
ধর্মান্ধ-ফ্যাসিস্ত রাত ঢেকেছে লজ্জায় মুখ তার! 

অমিত সরকার








জলের জন্য কবিতাগুচ্ছ  
রাহুজন্ম ভেসে যাচ্ছে অস্থির শ্রাবণে
জল বাড়তে বাড়তে অজান্তেই ছুঁয়ে ফেলছে বিপদসীমা
এতদিন একসাথে থাকতে থাকতে
আজকাল সেও অবাধ্য হয়ে গেছে খুব  
জাদুকাঠির শাসন না মেনে
ভিজিয়ে দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে আঙুলের ফাঁক দিয়ে
বোঝাচ্ছি খুব,  কিন্তু কথা শুনছে না     

তোমাকেও সাবধান করে রাখছি,
আমি কিন্তু আরেকটু হলেই গলে যাবো...
ভিজতে ভিজতে দেখা করতে আসোনি কখনো,
বৃষ্টি হতে পারে ভেবে এতদূর থেকে আসতে বারন করলে,
অথচ সেদিনই বাংলা আকাদেমি শুকনো খটখটে
কলেজস্ট্রিটের বুকের ভেতর
আমিই শুধু ভিজে যাচ্ছি, ভিজে যাচ্ছি...  
না হয়, একটু পরেই আসতে
না হয়, ভিজে যেত ফিকে সবুজ শাড়িটা,
প্রুফের গোছা, চ্যানেল সংবাদ, আমাদের পরচর্চার যাপনচিত্র
চর্যাপদ আর জলপরিরা,
আমি শুধুই দেখতে চেয়েছিলাম
রাগ ভাটিয়ারে বৃষ্টি নেমে আসছে তোমার আঁখিপল্লব থেকে...  

বৃষ্টি এলে এরপর থেকে তোমাকে জল বলে ডাকবো...      

একনজরে

সম্পাদকীয় - ' রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে'

' দরকার পড়লে আমি খুব প্রাদেশিক/ রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে' - বলেছেন কবীর সুমন। সত্যি কথা বলতে কী, রাষ্ট্র-এর ধারণাট...

পাঠকের নজরে